• ঢাকা
  • শনিবার , ৪ এপ্রিল ২০২৬ , সকাল ১১:২১
শিরোনাম
হোম / মতামত
রিপোর্টার :
মব সংস্কৃতি: সামাজিক অবক্ষয়ের নগ্ন বহিঃপ্রকাশ

মব সংস্কৃতি: সামাজিক অবক্ষয়ের নগ্ন বহিঃপ্রকাশ

প্রিন্ট ভিউ

বাংলাদেশের সমাজ আজ এক গভীর, নীরব কিন্তু ভয়াবহ সংকটের ভেতর দিয়ে অগ্রসর হচ্ছে—যার নাম মব সংস্কৃতি। আইন, ন্যায়বিচার ও মানবিকতার বাইরে দাঁড়িয়ে উত্তেজিত জনতার হাতে কাউকে শাস্তি দেওয়া, অপমান করা কিংবা প্রাণনাশের মতো ঘটনা ক্রমেই যেন স্বাভাবিক সামাজিক চিত্রে পরিণত হচ্ছে। যে ঘটনাগুলো একসময় ব্যতিক্রম হিসেবে আলোচিত হতো, আজ সেগুলো নিয়মিত খবরের অংশ। এটি কোনো আকস্মিক সামাজিক বিচ্যুতি নয়; বরং দীর্ঘদিনের অবহেলা, আইনের দুর্বল প্রয়োগ ও সামাজিক অসচেতনতার ফল। এই সংস্কৃতি শুধু কিছু মানুষের জীবন কেড়ে নিচ্ছে না, ধীরে ধীরে ক্ষয় করে দিচ্ছে রাষ্ট্রের ভিত্তি, আইনের শাসন এবং আমাদের সভ্য পরিচয়।

মব সংস্কৃতির সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হলো—এটি মানুষকে আইন মানতে শেখায় না; বরং আইনকে অপ্রয়োজনীয় ও অকার্যকর প্রমাণ করার এক বিপজ্জনক মানসিকতা তৈরি করে। যখন জনতা নিজেই বিচারক হয়ে ওঠে, তখন আদালত, তদন্ত ও প্রমাণের প্রয়োজনীয়তা প্রশ্নবিদ্ধ হয়। অথচ একটি সভ্য রাষ্ট্রের ভিত্তি গড়ে ওঠে সংবিধান, আইন এবং প্রাতিষ্ঠানিক বিচারব্যবস্থার ওপর। সেই ভিত্তি দুর্বল হলে রাষ্ট্র কেবল একটি ভৌগোলিক কাঠামোয় পরিণত হয়, যেখানে নাগরিকের জীবন ও নিরাপত্তার কোনো নিশ্চয়তা থাকে না।

মব মানসিকতার উত্থানের পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখছে গুজব, আবেগ ও তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া যাচাইহীন তথ্য, খণ্ডিত ভিডিও কিংবা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত পোস্ট মুহূর্তেই জনমনে উত্তেজনা সৃষ্টি করে। মানুষ সত্য যাচাইয়ের সুযোগ না দিয়েই সিদ্ধান্তে পৌঁছে যায়। ফলে সন্দেহই হয়ে ওঠে শাস্তির ভিত্তি। এই প্রক্রিয়ায় অপরাধী ও নিরপরাধের মধ্যে কোনো পার্থক্য থাকে না। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, পরবর্তীতে অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণিত হলেও ততক্ষণে ক্ষতি যা হওয়ার হয়ে যায়—যা সভ্য সমাজে কল্পনাতীত।

আইনের শাসনের মৌলিক দর্শন হলো—অপরাধ প্রমাণিত হবে আদালতে, শাস্তি কার্যকর করবে রাষ্ট্র। কিন্তু মব সংস্কৃতি এই দর্শনের সম্পূর্ণ বিপরীত। এখানে বিচার রূপ নেয় প্রতিশোধে, আর ন্যায় রূপ নেয় জনরোষে। যুক্তি ও প্রমাণের বদলে চলে শক্তির প্রদর্শন। এভাবে সমাজে যে বার্তা ছড়িয়ে পড়ে, তা অত্যন্ত ভয়ংকর—আইনের প্রয়োজন নেই, সংখ্যাই যথেষ্ট। এই মানসিকতা সমাজকে ধীরে ধীরে সহিংস ও নিষ্ঠুর করে তোলে।

মব সংস্কৃতির আরেকটি গুরুতর দিক হলো এর অপব্যবহার ও রাজনৈতিকীকরণ। বহু ক্ষেত্রে দেখা যায়, ব্যক্তিগত শত্রুতা, সামাজিক বিরোধ কিংবা রাজনৈতিক উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে জনতার আবেগকে পরিকল্পিতভাবে উসকে দেওয়া হচ্ছে। ‘জনতার ক্ষোভ’ বা ‘গণরোষ’-এর আড়ালে সংঘটিত হচ্ছে সংগঠিত সহিংসতা। এতে প্রকৃত অপরাধীরা আড়ালে থেকে যায়, আর নিরপরাধ মানুষ হয়ে ওঠে বলির পাঁঠা। এটি শুধু আইনবিরোধী নয়, এটি সমাজের নৈতিক অবক্ষয়েরও নগ্ন বহিঃপ্রকাশ।

এই সংস্কৃতি সমাজে তৈরি করছে এক গভীর ভয়ের সংস্কৃতি। মানুষ আজ নিরাপত্তাহীন—কারণ জানা নেই, কখন কোন গুজব, ভুল অভিযোগ বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত তথ্য তাকে জনতার কাঠগড়ায় দাঁড় করাবে। এই ভয় মানুষকে নীরব করে তোলে, প্রতিবাদহীন করে তোলে। মানুষ অন্যায়ের বিরুদ্ধে মুখ খুলতে সাহস পায় না, কারণ সে জানে—পরবর্তী লক্ষ্য সে নিজেও হতে পারে। অথচ ভয়ের ওপর দাঁড়িয়ে কোনো সমাজ কখনোই টেকসই হতে পারে না।

এই পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও অনিবার্য। প্রতিটি মব সহিংসতার ঘটনায় দ্রুত, স্বচ্ছ ও দৃষ্টান্তমূলক বিচার নিশ্চিত করতে হবে। অপরাধী যতই ‘জনতা’র অংশ হোক না কেন, তাকে আইনের আওতায় আনতেই হবে। আইন প্রয়োগে কোনো শৈথিল্য বা আপস এই সংস্কৃতিকে আরও শক্তিশালী করবে। একই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আরও দক্ষ, প্রযুক্তিনির্ভর ও মানবিক করে তুলতে হবে, যাতে তারা উত্তেজিত পরিস্থিতিতেও আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।

তবে শুধু রাষ্ট্রের উদ্যোগই যথেষ্ট নয়। নাগরিক হিসেবেও আমাদের দায়িত্ব রয়েছে। গুজব যাচাই ছাড়া শেয়ার না করা, উত্তেজনার মুহূর্তে সংযম দেখানো এবং আইন নিজের হাতে তুলে না নেওয়ার মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে আইন, মানবাধিকার ও নাগরিক দায়িত্ব বিষয়ে সচেতনতা বাড়ানো জরুরি। কারণ সচেতন নাগরিকই পারে মব মানসিকতার বিরুদ্ধে শক্ত সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে।

গণমাধ্যমের ভূমিকাও এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সংবাদের শিরোনাম, ভাষা ও উপস্থাপনায় দায়িত্বশীলতা না থাকলে তা উল্টো উত্তেজনা বাড়াতে পারে। তাই গণমাধ্যমকে সত্য যাচাই, সংযম ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি বজায় রেখে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুল তথ্য ও গুজব নিয়ন্ত্রণে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া সময়ের দাবি।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—মানবিক মূল্যবোধের পুনর্জাগরণ। একজন মানুষ অপরাধী হলেও তার রয়েছে আইনগত অধিকার ও মানবিক মর্যাদা। বিচার মানে প্রতিশোধ নয়; বিচার মানে ন্যায়, সত্য এবং সংশোধনের সুযোগ। এই বোধ হারিয়ে গেলে সমাজ কেবল নিষ্ঠুর ও অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে ধাবিত হবে।

আজ তাই দ্বিধাহীনভাবে বলতে হয়—মব সংস্কৃতি কোনো প্রতিবাদ নয়, এটি সভ্যতার শত্রু। এটি ন্যায়ের পথ নয়; এটি নৈরাজ্যের মহাসড়ক। এই সংস্কৃতিকে প্রশ্রয় দেওয়া মানে নিজের নিরাপত্তা, নিজের ভবিষ্যৎকেই হুমকির মুখে ফেলা।

আসুন, এখানেই এই অমানবিক সংস্কৃতির ইতি টানি। আইনকে শক্তিশালী করি, মানবতাকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করি এবং বিবেককে সামনে রেখে সিদ্ধান্ত নিই। একটি নিরাপদ, ন্যায়ভিত্তিক ও সভ্য বাংলাদেশ গড়ার জন্য রাষ্ট্র, সমাজ ও নাগরিক—সবাইকে একসঙ্গে দাঁড়াতে হবে। কারণ সভ্যতা নিজে থেকে টিকে থাকে না; তাকে রক্ষা করতে হয় সাহস, দায়িত্ববোধ ও নৈতিক দৃঢ়তার মাধ্যমে।

লেখকঃ প্রকৌশলী মোঃ নাজমুল হুদা মাসুদ, মেইন্টেইন্যান্স ইঞ্জিনিয়ার | সাইবার সিকিউরিটি এনালিস্ট (SB-CIRT) ও জয়েন্ট সেক্রেটারি (একাডেমিক), বাংলাদেশ কম্পিউটার সোসাইটি

মতামত

আরও পড়ুন